বৈশ্বিক শুল্ক আরোপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে শুনানিকালে গত বুধবার বিচারকরা জানতে চান, ট্রাম্প সত্যিই জাতীয় জরুরি অবস্থার আইনের আওতায় এত বড় পরিসরে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা রাখেন? নাকি তিনি কংগ্রেসের ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপ করেছেন? বিশেষজ্ঞদের মতে, এ মামলার ফলাফল মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা থাকবে। খবর রয়টার্স।
আদালতে ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে এ শুনানি। এ সময় রক্ষণশীল ও উদারপন্থী উভয় পক্ষের বিচারকরাই সরকারের আইনজীবীদের কাছে প্রশ্ন তোলেন।
১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রণীত হয় ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) বা আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন। এর অধীনে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সমালোচকদের মতে, মূলত জাতীয় নিরাপত্তা বা যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো অস্বাভাবিক জরুরি অবস্থায় বিদেশী সম্পদ জব্দ বা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে নিতে আইনটি প্রণীত হয়েছিল। নিয়মিত বাণিজ্যনীতির জন্য আইনটি করা হয়নি।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, ‘শুল্ক আরোপ মূলত কর আরোপের সমতুল্য। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কর আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে।’
তার মতে, দেশের অর্থনীতি ও নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে আইনের ব্যাখ্যা স্পষ্ট এবং কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমতি থাকা জরুরি। জন রবার্টস বলেন, ‘এটি খুব বড় ধরনের ক্ষমতা, আর এ ক্ষমতার ভিত্তি কতটা যুক্তিযুক্ত, সেটাই প্রশ্ন।’
ট্রাম্প প্রশাসনের আইনজীবী যুক্তি দেন, বাণিজ্য ঘাটতি ও বিদেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা মার্কিন অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুল্ক আরোপ করাই ছিল জরুরি। তবে বিচারক অ্যামি কনি ব্যারেট জানতে চান, ইতিহাসে কখনো ‘আমদানির নিয়ন্ত্রণ’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে সরাসরি শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কিনা।
অন্যদিকে উদারপন্থী বিচারক কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসন বলেন, ‘আইইইপিএ আইনটি মূলত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত রাখতেই করা হয়েছিল, বাড়াতে নয়।’
এর আগে নিম্ন আদালত রায় দিয়েছিল, ট্রাম্প আইইইপিএ আইনের অপব্যবহার করেছেন। এ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ১২টি মার্কিন অঙ্গরাজ্য মামলা করেছে। মামলাকারী অঙ্গরাজ্যের অধিকাংশই ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বাধীন।
তবে শুনানির সময় ট্রাম্পের প্রতি সহানুভূতি দেখান ব্রেট কেভানাহর কিছু রক্ষণশীল বিচারক। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনও একই ধরনের আইনের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
অন্যদিকে বিচারক নিল গরসাচ বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের হাতে এত ক্ষমতা দেয়ার অর্থ হতে পারে কংগ্রেস তার নিজস্ব সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দিয়েছে। এতে নির্বাহী ও আইন প্রণয়নক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।’
শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। এ মামলায় ট্রাম্প প্রশাসন জয়ী হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি। শুনানি শেষে স্কট বেসেন্ট আরো বলেন, ‘যদি সুপ্রিম কোর্ট এ আইনের অধীনে শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেন, তবে প্রশাসন অন্য আইন ব্যবহার করে শুল্ক চালু রাখার ব্যবস্থা নেবে।’
কবে এ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এ রায় ভবিষ্যতে বৈদেশিক বাণিজ্যনীতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে।